01605-292531
Taltola, Khilgaon 1219
যে বাক্য অশ্রুত অন্ধকার- ওয়াসি আহমেদ রাফি

যে বাক্য অশ্রুত অন্ধকার- ওয়াসি আহমেদ রাফি

‘দূর পৃথিবীর গন্ধে ভ’রে উঠে আমার এ বাঙালির মন
আজ রাতে; একদিন মৃত্যু এসে যদি দূর নক্ষত্রের তলে’
বিগত দু’দিন ধরে জীবনানন্দ যখন পূর্ন গ্রহনের মত গ্রাস করছিল আমাকে, তখন ‘যে বাক্য অশ্রুত অন্ধকার’ পড়া শুরু করলাম। লেখক ওয়াসি আহমেদের প্রথম গল্প সংকলন। বই এর নাম?একটু স্মৃতিতে আনুন রেনেগী কাদুর কবিতার বাক্যে সুনীলের অনুবাদে ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ বইতে,

”কুমারী, উত্তর দাও তুমি
যে বাক্য অশ্রুত অন্ধকার
আমার হৃদয় মৃদু ঝোঁকে
চাপ দেয় তোমার হৃদয়ে।”

আর প্রচ্ছদটি নাড়াচাড়া করে বিশ্লেষণ করার মতই,এ বইয়ের প্রচ্ছদের প্রতিটি দিক কথা বলেছে গল্প হয়ে!

বইটিতে মোট এগারটি গল্প রয়েছে। গল্প গুলোতে লেখকের পাঠ্যাভাস খুব ভাল করেই প্রতিফলিত হয়েছে। সবচেয়ে ভাল দিক ছিল, সাহিত্য কথা হয়ে উঠেছে মুখশ্রীর অবয়বে, এখানে আপনি জীবনানন্দকে অনুধাবন করতে পারবেন যেখানে লেখক পরাবাস্তববতা কে এনেছেন গল্পের ছত্রে। প্রকৃত সত্য কেবলমাত্র অবচেতনেই বিরাজ করে। পরাবাস্তববাদী শিল্পীর লক্ষ্য হল তার কৌশলের মাধ্যমে সেই সত্যকে গভীর থেকে তুলে আনা। আর সে ক্ষেত্রে লেখক তার প্রয়াসে যথেষ্ট সফল ছিল।

যে বাক্য অশ্রুত অন্ধকার- ওয়াসি আহমেদ রাফি

আমি নিজের মত করে এ বইয়ের গল্পের কিছু দিকের আকার দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

১. সংক্ষোভঃ বইটির শুরুর গল্প। থ্রিলারের পোশাকে আপনি আমেজ পাবেন উনিশ শতকে এসে আমাদের তামাদি হয়ে যাওয়া সভ্যতা যে তিনজনের হাত ধরে বড়সড় ঝাঁকুনি খেল, তাঁরা হলেন কার্ল মার্কস, সিগমুন্ড ফ্রয়েড আর চার্লস ডারউইন আর এঁদের মধ্যে ফ্রয়েডের কাজ ছিল মানুষের মন নিয়ে৷ রহস্যময় ফ্রয়েডকে ঘিরে গত একশো বছর ধরে কৌতূহল বেড়েছে বই কমেনি৷ এ গল্পে ও তার রেশ পাওয়া যায়।
নুসরাত হাসছে এমন করে! কীসের এতো আনন্দ ওর?
গল্পটি ধরার সাথে সাথে আমি ধরে ফেলেছিলাম কি হবে! তবু লেখনীর শৈল্পিক কারুকাজে আমি আটকে ছিলাম শেষ অব্দি!

২. জীবনের এইসব নিভৃত কুহকঃ এ গল্পটি পড়তে গিয়ে বর্ণনা গুলো বারবার বিভূতিভূষণের কথা মনে করে দিচ্ছিল। আপনার যদি বিভূতিভুষন, তারাশংকরকে ভাল লেগে থাকে, তাহলে এ গল্পে প্রতি অক্ষর গল্প শোনাবে কথা দিলাম! আবহমান বাংলার রাবেয়াদের কথা উঠে এসেছে। উপরি পাওয়া হিসাবে আপনি গল্পের মাঝে শঙ্খ ঘোষকে ও পড়তে পারবেন।

৩. একজন ব্যাধিগ্রস্ত মানুষঃ এ গল্পটা একটি ক্ষতের!আমাদের সামাজিক ভাবে জন্ম দেওয়া ক্ষত, এখানেও ফ্রয়েডকে খুঁজে পাওয়া যাবে! ভিয়েনার এই স্নায়ু চিকিৎসক মনে করতেন, আমাদের মন হল অনেকটা হিমশৈলের মতো৷ যার বেশিরভাগটাই বাইরে থেকে দেখা যায় না৷ বোঝা যায় না৷ বুঝতে হলে ডুব দিতে হয় অবচেতন মনের গভীরে৷ লেখক শেষে লিখেছেন, ‘একমাত্র একজন মানুষই তো পারে আরেকজন মানুষকে আপন করে নিতে’।

৪. কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডালঃ লেখক তার সর্বোত্তম অস্ত্র প্র‍য়োগ করেছে এ গল্পে। প্রথম থেকে শেষ অব্দি বিমোহিত হবে পাঠক। একটু খেয়াল করে দেখলে এ গল্প আমাদের গল্প। যাপনের গল্প। অবচেতনমনের ক্রিয়াকর্মকে নির্বিচারে গ্রহণ করলে, এ-অত্যাধুনিক যুগেও, সাহিত্য ও দর্শন চর্চায় দৈব বা ভৌতিক সত্তা তথা উদ্ভট-আশ্চর্যকর-অবাস্তব রূপকল্প হাজির হয়ে যায়। পাঠক শেষ করেও প্রশ্নে জর্জরিত!
“আচ্ছা,মামা। ধর্মপালের গল্পে বনের ভেতর গর্ত হয়েছিল কীভাবে?”

৫. বিকৃতিঃ এটা গল্প হলেও সত্যি! আমাদের গড়ে তোলা সভ্যতার বিষফোঁড়া যেন এ গল্পে ফুটে উঠেছে।আহামরি নয় গল্পের কাহিনি কিন্তু মস্তিষ্কবিকৃত মানুষের অভাব নেই বলেই হয়তো আজো আমার হৃদয়ে ছটফট করে দানবিক সমাজে। এ গল্পের পত্তন হয়েছে কবিরাজ দেওয়ানে চিশতীহ শাহ জালানুদ্দীন চিকিৎসালয়কে নিয়ে!

৬. জ্বরের দিনগুলোতে এক কাল্পনিক নগরীর মিথ্যা উপাখ্যানঃ আপনি,আমি যেসময়ে বিচরন করছি,সেসময় নিয়ে গল্প। আমাদের ছোটবেলার ত্রান দাতা আবার ফিরে এসেছে এখানে তার সেই পরিচিত রুপ নিয়ে। আগ্রহ জন্মালে পড়ে ফেলুন না হলে এ নগরে আর কোনদিন তার পায়ের চিহ্ন দেখা যাবে না!

৭. সাতটি তারার তিমিরঃ সাদামাটা প্রেক্ষাপটে কিন্তু কাহিনিতে নিজ্বসতা এ গল্পের উল্লেখযোগ্য দিক। ব্যাক্তিগত ভাবে আমাকে পার্সি বিশি শেলী টানে বলে এ গল্পের প্রেক্ষাপট আমার পড়তে ভাল লেগেছে।

৮. অবান্তর অথচ অকাট্যঃ এ গল্পের শুরুটা দারুন ছিল। মানিক বন্ধোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ যাদের দাগ কেটেছে মনে, ঠিক এ গল্পের বর্ননা ও তাদের মনে ধরবে। আমি আবার ও বলছি লেখকের পাঠ্যাভাস তার লিখায় প্রতিফলিত হয়েছে। এটা আমার অন্যতম ভাল লাগার গল্প ছিল ঠিক এই কারনে।

৯. চক্রঃ এ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রে নিদারুণ সমাজ চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। বেঁচে থাকার গল্পগুলো বরাবরই কৃত্রিমতা বর্জিত হয়, তাই আমাদের কাছে তা এক ঘেয়ে লাগে না। জীবন সংগ্রামের এক পযার্য়ে আদি ভৌতিকতা কেড়ে নিয়েছে কাহিনী মোড়, প্লটে প্লটে টুইস্ট ছিল!

১০.নিয়তিঃ আধুনিক জীবনের কিছু নিখাত সত্যি নিয়ে এ গল্প। খুব পরিচিত ঘরানার গল্প, এটা ছিল বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে। কাহিনী নির্ভর গল্প।

১১. তিনটি বাজে গল্পঃ

প্রথম বাজে গল্পঃ মুলত আমাদের ইন্দ্রিয়ের এক সুন্দর ব্যবচ্ছেদ করেছেন লেখক এ গল্পে। এসব লেখা পড়তে সবসময়ই ভাল লাগে আমার। প্রতিটি লাইন সুন্দর ভাবে চিত্রিত হয়েছে, লাইন গুলো পড়ার পরে ও মনে ধরে ছিল।

দ্বিতীয় বাজে গল্পঃ এটি আমার অন্যতম ভাল লাগার গল্প ছিল। আমাদের সুখ গুলো এমনি ভাবেই হয়তো আসা যাওয়ার মাঝে থাকে আর এর মাঝে জগতের সাম্যাবস্থা বজায় থাকে আসলে। খেয়াল করলে সকলের ভাল লাগার লিস্টে থাকার কথা এ গল্প।

তৃতীয় বাজে গল্পঃ এটা ঠিক গল্পের মত মনে হবে না আপনার কাছে। বস্তুত চেতনার মূল ভিত্তি হলো অযুক্তি ও অবচেতন। মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েডের ভাবনা- মানুষ অবচেতন মনে অনেক কিছুই করে বা ভাবে। তিনি বলেন- এ ভাবনা চেতন মনের চেয়ে অবচেতন মনেরই বেশি। আমি বারবার ফ্রয়েডকে আনলাম কারন আপনি পরাবাস্তবতা পড়বেন অথচ ফ্রয়েড জানবেন না,তা কখনোই হতে পারে না!

বই: যে বাক্য অশ্রুত অন্ধকার;
লেখক: Wasee Ahmed Rafi;
প্রকাশক: অবসর প্রকাশনী;
মুদ্রিত মূল্য: ১৮০ টাকা

There are no reviews yet.

Leave a Reply

}catch (ex){}