01605-292531
Taltola, Khilgaon 1219
10 Minutes 38 Seconds in This Strange World by Elif Shafak

10 Minutes 38 Seconds in This Strange World by Elif Shafak

যারা এলিফ শাফাকের লেখার সঙ্গে পরিচিত তাঁরা টেন মিনিটস থার্টি এইট সেকেন্ডস ইন দিস স্ট্রেইঞ্জ ওয়ার্ল্ড পড়ে চমকে যাবেন না সেটি নিশ্চিত করে বলা যায়। তবে এটি যদি আপনার পড়া এই লেখকের প্রথম উপন্যাস হয় তবে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে বিভিন্ন রকমের বিস্ময়।

প্রথমত এই উপন্যাসটি একজন মৃত মানুষের জীবনের ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ, এবং এই ঘটনাপ্রবাহ বা স্মৃতিচারণ ঘটছে মৃত মানুষটির হৃদপিন্ড বন্ধ হয়ে যাবার পরে।মানে আক্ষরিক অর্থে মরে যাবার পরেও তাঁর চেতনা অক্ষত আছে এবং তা অনুভূতিসম্পন্ন একটি চেতনা। মজার ব্যাপার হলো, এই ব্যাপারটি লেখক কল্পনা করে নেননি। মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় আবিষ্কৃত হয়েছে যে মানুষ মৃত্যুবরণ করার পরেও তাঁদের মস্তিষ্ক, অর্থাৎ চিন্তাশক্তি চলমান থাকে ব্যক্তিবিশেষে প্রায় দশ মিনিট পর্যন্ত।

10 Minutes 38 Seconds in This Strange World

দ্বিতীয়ত,একটি বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে রচিত হলেও উপন্যাসের গঠনটি মোটেই বিজ্ঞানসর্বস্ব নয়। তিন ভাগে বিভক্ত উপন্যাসের ভাগগুলোর নাম, মাইন্ড, বডি আর সৌল। মানুষের মন শরীর আর আত্মা এই তিনের মধ্যে সম্পর্ককে বৈজ্ঞানিকরা যেভাবে ব্যাখ্যা করেন ধর্ম একইভাবে করে না। আবার আত্মা বলে আদৌ কিছু আছে কি না তা নিয়েও রয়েছে বিস্তর বাহাস।মন কি শুধুই মগজের সঙ্গে সম্পর্কিত নাকি চিন্তাশক্তির সঙ্গে অনুভূতি মিলে তা হয়? অনুভূতিগুলো তো সব ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়, পঞ্চ ইন্দ্রিয় ছাড়াও তো মানুষের অনুভূতি নানাভাবে অনুভূত হয়, তাহলে মন আর মস্তিষ্ক এক হয় কী করে?

এইসব প্রশ্ন করেন না লেখক, তবে পাঠকের মনে এসব নানা পরস্পরবিরোধী চিন্তার উদয় হবে। অবিশ্বাসী পাঠক যেভাবে উপন্যাসের উপসংহার পড়বেন, বিশ্বাসী পাঠক সেভাবে পড়বেন না। আবার সংশয়বাদীদের জন্য উপসংহারটুকুকে মনে হতে পারে উপন্যাসের সবচেয়ে কাব্যিক অংশ।

শাফাক নিজে একজন সমাজসচেতন লেখক। যে বৈজ্ঞানিক তথ্য জেনে তিনি বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছেন সেই তথ্যকে ঘিরে তিনি লিখেছেন এমন এক আখ্যান যাতে থিওরি আর হাইপোথিসিসের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে বাস্তবতা। সমাজের নিষ্ঠুর বাস্তবতা। নারীর প্রতি সমাজের অবহেলা, রুপান্তরকামী মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের অন্যায়, বেশ্যার প্রতি সমাজের সকলের ঘৃণা, সন্তান জন্মদানে সমর্থ হবার পরেও একজন সামাজিক নারীর প্রতি পরিবারের অবিচার- এসবকিছুই স্পষ্ট হয়ে এসেছে টেকিলা লেয়লা নামের বেশ্যার মৃত্যুর আগের ও পরের ঘটনাপ্রবাহে। শিশুকামী চাচার ধর্ষণের শিকার লেয়লা একটি গর্ভপাতের পর বাড়ি থেকে পালায়। সে জানতো না ইস্তাম্বুল শহর, লেখকের মতে একটি স্ত্রীলিঙ্গ শহর হলেও একটি একলা মেয়ের প্রতি কতটা নিষ্করুণ হতে পারে। বেশ্যাবাড়িতে বিক্রি হয়ে যায় সে। লেয়লার আগের জীবনের সবকিছু সে ভুলে যেতে চায়, লেয়লা অংশটুকু রেখে নামের বাকি অংশ মুছে ফেলে, লেয়লা অংশের বানানটিও বদলে নেয়।

একটি একটি করে মিনিট পেরোয়, লেয়লার জন্ম থেকে স্মৃতিরা ফিরে আসতে থাকে। স্মৃতির সঙ্গে আসে বর্ণ গন্ধ স্বাদ। উপন্যাসের পরবর্তী অংশে আসে লেয়লার বন্ধুদের কথা। নস্টালজিয়া নালান, স্যবোটাজ সিনান, হলিউড হুমেয়রা, জয়নাব ১২২ আর জামিলা হচ্ছেন লেয়লার সেই পাঁচ বন্ধু যাদের কাছে লাশ দিতে অস্বীকৃতি জানান মর্গের পরিচালক। তাঁর সাফ কথা, আপনারা পরিবারের সদস্য নন। নালানের খুব অবাক লাগে, পরিবার কি শুধু রক্তের হয়? কখনো কখনো তো রক্তের চেয়ে পানির ঘনত্ব বেশি হয়। তা না হলে পরিবারের কেউ যখন লেয়লার সঙ্গে সম্পর্ক স্বীকার করে না, সিনান কেন নিজের বউবাচ্চাকে মিথ্যা বলে লেয়লার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন এতোদিন ধরে? হুমেয়রার হাঁপানির চিকিৎসা কেন করাবে লেয়লা, যেখানে নিজেই মৃত স্বামীর দেনার দায় মেটাতে ফিরে গেছেন কলংকিত পেশায়? আর জয়নাবই বা কেন দোয়াদরুদ পড়ে হালুয়া বিলাবে লেয়লার আত্মার সহজ মুক্তির আশায়?

হুমেয়রা আর লেয়লা রাস্তার বিড়ালকে বাঁচাতে পশুর ডাক্তারের মজুরি দিয়েছিলেন অনেক টাকা। অথচ এই মানবিক মানুষদের পরিচয় তাঁরা বেশ্যা আর ক্লাবের গায়িকা। সমাজের কেউ সম্পর্ক স্বীকার করে না তাঁদের সঙ্গে। নালান নারী হতে চেয়েছিলেন, অনেক ব্যয়বহুল এবং যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই রুপান্তর সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু আর দশজন বেশ্যার মতন ব্রথেলে চাকরি করতে পারেননি তিনি। লাইসেন্স দেবে না সরকার, তাই রাস্তা থেকে খদ্দের যোগাড় করে চলতে হয় তাঁকে। জয়নাবের খর্বতা, জামিলার ধর্ম পরিবর্তন- এসব কিছুই তাঁদের প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকতর করে তুলেছে। এই মানুষগুলোর মধ্যে আরো একটি মিল হলো, এঁরা সবাই লেয়লাকে ভালোবাসতেন। এঁরা কেউ চাননি বেওয়ারিশদের গোরস্থানে লেয়লার কবর হোক।

সমকামী যে ছেলেটিকে ‘সংশোধন’ করার জন্য তাঁর বাবা তাঁর কাছে লেয়লাকে পাঠিয়েছিলেন, লেয়লার শেষ খদ্দের- তাঁর সামান্য উপস্থিতি উপন্যাসটিকে আরো বেশি হৃদয়স্পর্শী করেছে। টেকিলা লেয়লার স্বামী বামপন্থী ডি/আলি যেন অন্ধকার রাতে বিদ্যুৎ চমকের মতন। যদিও সেই আলো স্থায়ী হয় না, পথ দেখায় না, কিন্তু অন্ধকারকে চিরে দেয় একটু হলেও। লেয়লার কষ্টের জীবনের একটা বছর সে সুখে ছিল ডি/আলি নামের শিল্পীর সঙ্গে। তাঁদের প্রেমের বর্ণনা খুব বেশি নেই, যেটুকু আছে সেটুকুই অনবদ্য।

এলিফ শাফাকের গদ্য অসাধারণ, ঝরঝরে সাবলীল এবং একই সঙ্গে কাব্যিক। সীমাবদ্ধতা বলতে হলে বলতে হবে লেখক ইস্তাম্বুল শহরের প্রতি অতি মুগ্ধ। শহরটিকে তিনি জীবন্ত চরিত্র হিসেবে দেখেন, সেভাবেই আঁকেন। ইস্তাম্বুলের জন্য একরাশ মুগ্ধতা এর নিষ্ঠুর কদর্য চেহারাকে আড়াল করে রাখে কি? কিংবা হয়তো লেখক দেখাতে চান যে ইস্তাম্বুল তাঁর প্রিয় শহর হলেও তা পৃথিবীর বাইরের নয়। বাকি দুনিয়াটার মতন ইস্তাম্বুলও অন্যায় অবিচার আর অত্যাচারে ভরা।

There are no reviews yet.

Leave a Reply

}catch (ex){}